মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

লীগাল নোটিশ লেখার কায়দা কানুন (০০০৮)


লেখাটা মূলত নবীন আইনজীবি ভাই-বোনদের জন্য, লক্ষ্য করেছি অনেক সিনিয়র আইনজীবি জুনিয়রদের ঠিকমত লীগাল নোটিশ লেখা শেখান না বা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার, অনেক ক্ষেত্রে সিনিয়র নিজেও ঠিকমত লেখার কায়দা কানুন জানেন না। আশা করি আমার এই লেখা নবীন আইনজীবি ভাই-বোনদের কিছুটা হলেও কাজে আসবে।

১) মক্কেল যতই অনুরোধ করুক না কেন, লীগাল নোটিশে কাউকে কোনরূপ গালাগালি করবেন না, লীগাল নোটিশে অপরপক্ষকে ‘হার্মাদ, চরিত্রহীন...’ জাতীয় বিচিত্র বিশেষণে প্রাচীনকালের আইনজীবিরা অনেক সময় ভূষিত করতেন, গালাগালির এই ধারাটা ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকুক, এটাকে আবার ফিরিয়ে আনার কোনই কারণ নেই।

২) মক্কেল লীগাল নোটিশে অনেক কিছুই বলতে চাবে, আইনজীবি হিসেবে এটা আপনার নিজ দ্বায়িত্ব যে মক্কেলের চাহিদার মধ্যে যতটুকু আইনে গ্রাহ্য হবে বা যা নিয়ে কন্টেস্ট করা যাবে শুধুমাত্র সেটুকু লীগাল নোটিশে তুলে ধরা। লীগাল নোটিশ পুরোপুরি মক্কেলের চাহিদা মত লিখলে প্রায় সময়ই অপর পক্ষের আইনজীবি এবং কোর্টের কাছে ‘ব্যাক্কল’ হিসেবে চিহ্নিত হবার ভাল সম্ভাবনা থাকে (কারো মনে আছে কিনা জানিনা ক্রিকেটার রুবেলের জামিনের পর চিত্রনায়িকা হ্যাপীর চাহিদা অনুযায়ী জনৈক ডক্টরেট ডিগ্রীধারী আইনজীবি জামিনদাতা বিচারককে রুবেলকে কেন জামিন দেয়া হয়েছে এই মর্মে লীগাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন)

৩) লীগাল নোটিশের বক্তব্য হওয়া উচিত সংক্ষিপ্ত এবং লেখা উচিত ছোট ছোট আলাদা প্যারায়। গদ্য সাহিত্যর আদলে এক গাদা কথা এক জায়গায় লিখলে সেটা পড়া এবং পড়ে বোঝা সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই (যার মধ্যে ভবিষ্যতে কোর্টের বিচারকগনও থাকতে পারেন) নিদারুন শ্রম ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

৪) লীগাল নোটিশের ভাষা হওয়া উচিত আইনজীবির দক্ষতা অনুযায়ী, ‘সেইরাম’ দক্ষতা না থাকলে জটিল বিষয়ে ইংরেজীতে লীগাল নোটিশ পাঠানো একান্তই অনুচিত, অবশ্য আমি এমন আইনজীবিও দেখেছি যারা বাংলাতেও ঠিকমত লীগাল নোটিশ লিখতে পারেন না।

৫) লীগাল নোটিশে ফাপড় দেয়া/যুক্তিহীন ঝাড়ী দেয়া/আইনী সমর্থনহীন দাবী করা নিতান্তই অনুচিত, মনে রাখতে হবে কোন না কোন সময় এই লীগাল নোটিশ অপর কোন আইনজীবির হাতে যাবে, অতএব আরেকজন আইনজীবির চোখে নিজেকে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা প্রমান করার আদৌ কোন দরকার আছে কি?

৬) লীগাল নোটিশের মূল সুত্র হচ্ছে = (কি অভিযোগ)+(কি সমাধান কবের মধ্যে চাই)+(চাহিদা মত সমাধান না হলে কি করা হবে)।       

৭) অনেক ক্ষেত্রে লীগাল নোটিশের সময়সীমা থাকে, যেমন চেক ডিজঅনারের মামলার ক্ষেত্রে শেষবার চেক ডিজঅনার হবার ত্রিশ দিনের মধ্যে লীগাল নোটিশ না পাঠালে এর পরে আর কোন লীগাল নোটিশ পাঠানো একান্তই অর্থহীন। 

৮) লীগাল নোটিশে ‘এর বিচার আল্লাহ করবে’, ‘র‌্যাবের কাছে বিচার দেব’, ‘পুলিশকে জানাবো’ এই জাতীয় কথা ভুলেও লিখবেন না, আপনার যে আইনগত কোন মুরোদ নেই তা এই ধরনের কথাতে একেবারে পরিস্কার হয়ে যাবে।

৯) মনে রাখবেন আপনি যাকে লীগাল নোটিশ পাঠাবেন সেও প্রায় সব ক্ষেত্রেই আপনাকেও আরেক লীগাল নোটিশের মাধ্যমে জবাব দেবে, কাজেই আপনাকে ‘পেয়ে বসবে’ এমন কোন কিছু নিজের লীগাল নোটিশে রাখবেন না।     

১০) লীগাল নোটিশ সাবধানে ড্রাফট করুন এবং পাঠানোর আগে অবশ্যই তা মক্কেলকে দেখিয়ে নিন, মক্কেল প্রাথমিক ভাবে আপনাকে ভুল তথ্য দিতে পারে, ড্রাফটিং এর সময় আপনারও ভুল হতে পারে আবার লীগাল নোটিশের ড্রাফট দেখার পর মক্কেলেরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন কোন তথ্য মনে পড়তে পারে।

১১) জীবন মরন সমস্যা না হলে লীগাল নোটিশ ড্রাফটিং এর ব্যাপারে তারাহুড়া করবেন না, আপনার পাঠানো লীগাল নোটিশ যে মামলার সময় কোর্টে উপস্থাপন করা হবে এবং ব্যাপারটা মামলা পর্যন্ত গড়ালে মামলার আর্জী যে এই লীগাল নোটিশের আদলে ড্রাফট করতে হবে কথাটা লীগাল নোটিশ ড্রাফটিং এর সময়  মাথায় রাখবেন।           

১২) পাঠানোর আগে বার বার লীগাল নোটিশটি পড়ে দেখুন, বানান বা ক্রমিক সংখ্যা ভুল আছে কিনা দেখুন, লেখায় যৌক্তিকতা, ধারাবাহিকতা এবং সাবলীলতা বজায় আছে কিনা দেখুন, পরিশেষে একটি ছোট কিন্তু কার্য্যকর পরামর্শ, দেখা শেষ হলে কয়েক ঘন্টা ড্রাফটটা ফেলে রাখুন, এরপর আবার পড়ুন, অনেক সময় কিছু ভুল কেবল কিছু সময় পার হবার পর আমাদের চোখে ধরা পরে।

১৩) পাঠানোর আগে মান উন্নত করার স্বার্থে যতবার খুশী ভাষা পরিবর্তন করুন, কাগজের বা প্রিন্টিং বিলকে কখনো উন্নত মানের কাজের বিরুদ্ধে দাড়াতে দেবেন না।

১৪) শেষ টিপস, বিষয়টা জটিল হলে লীগাল নোটিশ পাঠানোর আগে আপনার পরিচিত কোন ভাল আইনজীবিকে ড্রাফট দেখিয়ে নেবেন।

ধন্যবাদ।         


লেখক:

Kazi Wasimul Haque
Lawyer at Supreme Court of Bangladesh

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন