ধর্ষন সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে সচেতন নাগরিক মাত্রেই কমবেশী ধারনা রাখেন কিন্তু ধর্ষনের বিচার চাইতে গেলে বিচার প্রার্থীদের যে কি পরিমান ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয় সেটা এমনকি অনেক উকিলও জানেন না।
আমার এই লেখাটা মূলত বিচার চলাকালীন সময় নিয়ে, বাংলাদেশের আইনে একজন বিচার প্রার্থীকে কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হয় তার সাথে কি হয়েছিল, কি তার অভিযোগ, বিচারক যদি ইচ্ছা করেন তাহলে মামলার সাথে সম্পর্কহীন সকল ব্যাক্তিকে কোর্ট থেকে সরিয়ে দিয়ে বাদীর বক্তব্য শুনতে পারেন আবার ইচ্ছা করলে মামলা সংক্রান্ত সবাইকে নিয়ে তা নিজের খাস কামরায়ও শুনতে পারেন, তবে মামলা জটের কারনে বিচারকরা সাধারনতঃ এ ধরনের টানা-হ্যাচরা করেন না।
কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে ধর্ষকের (যদি গ্রেফতার হয়ে থাকে) এবং এক গাদা অপরিচিত লোকের উপস্থিতিতে একজন ধর্ষিতার পুরো ঘটনাটির বর্ননা দেবার বিষয়টা যে কতখানি ট্রমাটিক সেটা সেই মেয়েটা ছাড়া আর কেউ অনুভব করেন কিনা তা নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে, প্রথমটা যদি দৈহিক ধর্ষন হয় তাহলে কোর্টে সবার সামনে দাঁড়িয়ে বিচারপ্রার্থীর পুরো ঘটনার বর্ননা দেয়ার বিষয়টা নিঃসন্দেহে মানসিক ধর্ষনের পর্যায়ে পরে।
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে লোক লজ্বার ভয়ে ধর্ষিতারা বিচার চান না, আর কালেভদ্রে কেউ যদি বিচার চেয়েই বসেন, তাহলে উপরে বর্নিত মানসিক ধর্ষনের পর শুরু হয় আসামী পক্ষের উকিল কতৃক ধর্ষিতার বক্তব্যের কাটা-ছেড়া, আসামী পক্ষের উকিলদের প্রধান চেষ্টা থাকে আদৌ এমন কোন ঘটনা ঘটেনি তা প্রমান করা, অপ্রিয় হলেও এটা সত্য যে চাক্ষুষ স্বাক্ষী (থাকাটা প্রায় অসম্ভব) বা করবোরেটিং এভিডেন্স না থাকলে বা আসামী স্বয়ং দোষ স্বীকার না করলে রেপ কেস প্রমান করা অত্যন্ত কঠিন একটা বিষয়।
আর যদি দৈহিক মিলনের ব্যাপারটা প্রমান হয়েই যায় তাহলে আসামী পক্ষের উকিলেরা এটা দেখানোর চেষ্টা করেন যে ব্যাপারটা সম্মতিমূলক ছিল, সব চেয়ে আজব ব্যাপার হচ্ছে ধর্ষনের ক্ষেত্রে মেয়ের চরিত্র কোন ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ না হলেও (সত্যিকার নির্ভেজাল সম্মতি ছিল কি ছিল না সেটাই হচ্ছে ডিসাইডিং ফ্যাক্টর, সত্যি কথা বলতে পতিতার সাথে জোর পূর্বক মিলিত হলে আইনগত হিসেবে সেটাকেও ধর্ষন হিসেবে গন্য করা যায়) আসামী পক্ষের উকিলরা আপ্রান চেষ্টা করেন মেয়েটিকে চরিত্রহীন এবং উগ্র টাইপ হিসেবে দেখানোর জন্য।
এটাতো গেল কোর্টের ভিতরের অংশ, মামলা চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশে আসামী পক্ষ কতৃক মেয়েকে এবং মেয়ের পরিবারকে হুমকি-ধমকি দেয়া আর মিটমাটের জন্য সামাজিক ভাবে চাপ প্রয়োগ করা মোটামুটি ভাবে ঐতিহ্য হিসেবে গন্য করা যেতে পারে।
এখানে একটা প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশে এত আইন সহায়তা দানকারী এনজিও আছে, তারা কি করে, তারা কি সাহায্য করতে পারেনা ? আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি এই সব আইন সহায়তা দানকারী সংস্থাগুলি আইনী পরামর্শ, সালিশ-মীমাংশার জন্য যথেষ্ট ভাল হলেও কোর্টে গেলে ট্রায়াল স্টেজে রুটিন মাফিক কুপোকাত হয়, না তাদের সদিচ্ছার কোন অভাব নেই কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তারা তাদের নিয়োজিত উকিলদের যে পরিমান সম্মানী দেয়, তার চেয়ে অনেক বেশী টাকা ভাল উকিলেরা তাদের গাড়ী এবং ড্রাইভারের পিছনে ব্যয় করে, দ্বিতীয়তঃ আমরা উকিলেরা যখন সদ্য পাশ করে বের হই তখন আমাদের মন অনেক নরম থাকে এবং আমরা মানুষদের আসলেই সাহায্য করতে চাই, কয়েক বছর প্র্যাক্টিস করার পর যখন আমরা সিনিওর হয়ে যাই, আমাদের মনের সদিচ্ছাগুলি মরে যায় এবং আমাদের মধ্যের সেরারা টাকার স্বাদ পেয়ে যায় তখন এইসব এনজিও গুলি আমাদের নিয়োগ দিতে চায়, ফলাফল? অশ্বডিম্ব।
আরেকটা ব্যাপার না বলে পারছি না, বাংলাদেশে ফৌজদারী অপরাধে বাংলাদেশ সরকার বাদী হিসেবে কাজ করে, অর্থাত সরকার নিয়োজিত উকিলরা বাদীপক্ষকে রি- প্রেজেন্ট করে, যদি এই সব সরকারী উকিলের মান ভাল হয় (রেয়ার কেস) তাহলে বাচোয়া, আর যদি উকিল সাহেবের ‘চা-পানি’ খাবার অভ্যাস থাকে, তাহলে কি হয় বুঝতেই পারছেন, আরেকটা সমস্যা আছে, বাদী যদি নিজে উকিল রাখে তাকে আবার সরকারী উকিলের মর্জি মাফিক চলতে হয়, যে কোন আত্মসম্মান এবং দক্ষতা সম্পন্ন উকিলের জন্য ব্যাপারটা খুবই অবমাননাজনক এবং এই সব কেসে ভাল উকিল না পাবার এটা একটা বড় কারন।
যদি ধর্ষন কেসের বাদীকে আমরা আসলেই সাহায্য করতে চাই, আমাদের উচিত হবে সবার আগে বাদীকে এবং তার পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়া, বাদীকে উকিল নিয়োগ দেবার স্বাধীনতা দেয়া এবং সেই উকিলকে সরকারী উকিলের প্রভাব বলয়ের বাইরে থেকে কাজ করতে দেয়া, বিচার ব্যাবস্থাকে দ্রুত এবং মানবিক করা, বাদীর মান সম্মান রক্ষা করে ট্রায়াল করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনকে কঠোর ভাবে প্রয়োগ করা যাতে আসামী পক্ষের উকিলেরা বাদীকে কোর্টে অপ্রাসঙ্গিক এবং অপমানজনক প্রশ্নের মাধ্যমে হয়রানী করতে না পারে।
লেখক:
Kazi Wasimul Haque
Lawyer at Supreme Court of Bangladesh

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন