সোমবার, ৩০ জুলাই, ২০১৮

রেপ এবং আদালতের কিছু অজানা অধ্যায় (০০০৭)



ওসিঃ      কয়েকদিন ধরে দেখি থানার চারপাশে ঘুরছেন, কি চান?

মহিলাঃ    ধর্ষন মামলা করতে চাই।


ওসিঃ      (মহিলার বয়স এবং ‘রূপ-যৌবন’ বিবেচনা করে) কে হয়েছে, আপনার মেয়ে না ছেলের বউ?

মহিলাঃ    আমি নিজে


ওসিঃ      (ভ্রু কুচকে) সত্যি কথা বলেন, কেন এই কেস করতে চান ?

মহিলাঃ    (কিছুটা ইতস্ততঃ করে) জমি নিয়ে গন্ডগোল, জন্মের মত শিক্ষা দিতে   চাই।



ওসিঃ      (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) ঘরে আর কেউ নেই?

মহিলাঃ    না



ওসিঃ      (দীর্ঘতর শ্বাস ফেলে) না করলে হয় না?

মহিলাঃ    না বাবা। 



ওসিঃ      ঐ কে আছিস, উনার এজাহারটা লিখে নে।





গল্প মনে হচ্ছে? এটা একান্তই সত্য ঘটনা, অনেক দিন আগে পল্লবী থানার এক ওসির কাছ থেকে তার পেশা জীবনের এই কাহিনী শুনেছিলাম।

গত লেখায় আমি রেপ পরবর্তী বিচার ব্যবস্থা নিয়ে লিখেছিলাম, আজ আমি তার আরেকটা দিক আপনাদের বলব।

আপনাদের কি কখনো মনে হয়েছে যে বাংলাদেশে রেপের বিচার খুব ধীরে হয় বা অনেক ক্ষেত্রে মোটেই বিচার হয়না? যদি এমনটি মনে হয়ে থাকে তাহলে ঠিকই মনে হয়েছে। এই অব্যবস্থার জন্য যারা অনেকাংশে দায়ী তাদের উল্লেখ কোথাও পাবেন না, কোন টকমারানী, কোন মিডিয়া, কোন আইনী সহায়তা দানকারী সংস্থা এটা নিয়ে আলোচনা করেনা, কিন্তু বাংলাদেশে যদি কখনো রেপের বিচার দ্রুত এবং সুষ্ঠু ভাবে করতে হয়, এই সমস্যাটার সমাধান করেই করতে হবে, এটাকে এড়িয়ে যাবার কোন উপায় নেই।

আপনাদের জ্ঞাতার্থে আমি, বাংলাদেশের একজন সুপ্রীম কোর্ট এনলিস্টেড আইনজীবি, এই মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে বাংলাদেশে রেপের বিচার ধীরে এবং অনেক সময় মোটেই না হবার  পেছনে প্রায় ক্ষেত্রে মিথ্যাশ্রয়ী বাদীপক্ষ দায়ী।

ব্যাখ্যা করছি_  আপনারা যারা আইনজীবি না তারা রেপ কেসের কথা শুনলেই কুচকে যান, তখনি ধরে নেন অভিযুক্ত ব্যাক্তিটি নিঃসন্দেহে কাজটা করেছে, আমরা আইনজীবিরা সাথে সাথে তা করিনা, আগে আমরা এজাহারটা পরি, তারপর সিদ্ধান্তে পৌছাই। উদাহরন দেই_  এজাহারে আছে দবির ১৫ বছরের কিশোরী সখিনাকে ধর্ষন করেছে, মিডিয়াতে এটুকুই এসেছে আর সেটা নিয়ে সবাই রীতিমত ঝড় তুলে ফেলছে, কিন্তু মিডিয়াতে যেটা আসেনি সেটা হচ্ছে দবিরের বয়স ৮৫ এবং সখিনার বাপের সাথে দবিরের জমি সঙ্ক্রান্ত মামলা চলছে, যে উদাহরনটা এই মাত্র দিলাম সেটা আমার নিজের এক কেসের সত্যি ঘটনা (নামগুলি শুধু বদলে দেয়া), বার্ধক্যের কারনে এই কেসের অভিযুক্ত দবির ঠিক মত হাটতেই পারতো না, মাঝে মাঝে সন্দেহ হত আমার সামনেই অক্কা পাবে কিনা, মাঠের মধ্যে সখিনাকে ফেলে ‘ইয়ে’ করা তো অনেক পরের ব্যাপার।

জ্বী, যারা এখনো বুঝতে পারেননি তাদের বলছি, বাংলাদেশে সত্যিকার রেপ কেসের পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমান ভুয়া রেপ কেস ফাইল হয়, এবং যেহেতু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই সব কেস চালানো হয় তাই সত্যিকার কেসের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে এই সব ভুয়া কেসের পিছনেও শ্রম ও সময় দিতে হয়। ফলতঃ  উদ্ভুত মামলা জটের কারনে সত্যিকার রেপ কেসগুলিও পিছিয়ে যায়।

উকিল হিসেবে আমি বলতে পারি বাংলাদেশে যে কয়টা রেপ হয় তার সিংহভাগ কেস কোর্ট অবধি পৌছায় না, লোকলজ্জা ঠেলে, ভয়-ভীতি কাটিয়ে, দিনের পর দিন উকিল আর কোর্টের কাছে দৌরানোর মত দম, ইচ্ছা বা সামর্থ্য খুব কম মেয়েরই থাকে। আবার কেসগুলি পরে ভুয়া রেপ কেস দেখতে দেখতে ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে যাওয়া জাজ সাহেবদের সামনে, ফলে যেটুকু সহানুভূতি বা সময় নিয়ে জাজ সাহেবদের কেসটা বিবেচনা করার কথা ছিল, তারা তা করেন না।

আমি আগের লেখায় ব্যাখ্যা করেছিলাম কেন এই ধরনের কেসে ভাল উকিল পাওয়া যায় না, তাই এখানে সেটা নিয়ে আর লেখলাম না।

তো এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরনের উপায় কি? আমার মতে উত্তরনের উপায় হচ্ছে যখন পরিস্কার বোঝা যাবে কেসটা মিথ্যা, তখন বাদীকে কঠোর কোন শাস্তি দেয়া, কোন কেস ভুয়া কিনা সেটা বিবেচনা করবেন জাজ সাহেবদের একটি প্যানেল।

যখন মানুষ টের পাবে ভুয়া রেপ কেস করলে ‘খবর আছে’ তখন আস্তে আস্তে ভুয়া কেস করা কমিয়ে দেবে এবং সত্যিকার কেস গুলি তখন সামনে আসবে, যা দ্রুত এবং সঠিক ভাবে সমাধান হবে বলে আমরা যৌক্তিক ভাবে আশা করতে পারি। 

লেখক:

Kazi Wasimul Haque
Lawyer at Supreme Court of Bangladesh

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন